বাগেরহাটে ১৪ মৃত্যু: ‘একসঙ্গে এত লাশ, সহ্য করার মতো না’
“আশপাশের নয়টা মসজিদ থেকে খাটিয়া আনা হয়েছে। গোসল শেষ একে একে নয় স্বজনকে রাখা হয়েছে খাটিয়াতে।”
বাগেরহাটের মোংলা উপজেলা পরিষদ সংলগ্ন শেহলা বুনিয়ায় আব্দুর রাজ্জাকের বাড়িতে অসংখ্য মানুষের ভিড়। সবাই শোকে স্তব্দ। কারো মুখে কোনো শব্দ নেই। শুধু ভেসে আসছে কান্নার শব্দ।
নিহত রাজ্জাকের প্রতিবেশী শরীফ হাবিবুর রহমান বলেন, “একসঙ্গে এতগুলো লাশ আগে দেখিনি। এটা সহ্য করার মতো না।
“এই বাড়িতে হাসি আনন্দ-হাসিতে গমগম করার কথা ছিল, সেখানে কান্নার রোল পড়েছে।”
বাগেরহাটের রামপালে নৌ-বাহিনীর বাসের সঙ্গে একটি মাইক্রোবাসের মুখোমুখি সংঘর্ষে ১৪ জন নিহত হয়। মৃতদের মধ্যে মোংলা পোর্ট পৌরসভার ৮ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি আব্দুর রাজ্চাকসহ তার পরিবারের নয়জন রয়েছেন।
সকালে আব্দুর রাজ্জাকের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, বাড়ির ভেতরে পরিবারের নিহত চার নারীর লাশ রাখা হয়েছে। আর পাশে উপজেলা পরিষদ চত্বরে রাখা হয়েছে বাকি পাঁচ জনের মরদেহ।
আব্দুর রাজ্জাকের লাশের পাশে দাঁড়িয়ে অঝোরে কাঁছিলেন তার ছোট ভাই মো. সাজ্জাদ সরদার।
তিনি বলেন, “আমাদের বেড়ে ওঠা মোংলাতেই। তবে গ্রামের বাড়ি খুলনার কয়রায়। রাজ্জাক ভাই তার মেয়ের বিয়ে দিয়েছে কয়রায়। এই ছেলেরও সেখানে বিয়ে দিয়েছিল। কিন্তু একটি দুর্ঘটনা সব ওলটপালট করে দিল।”
আব্দুর রাজ্জাক তার ছোট ছেলে আহাদুর রহমান সাব্বিরকে কয়রা উপজেলার নাকশা এলাকার আবদুস সালাম মোড়লের মেয়ে মার্জিয়া আক্তারের (মিতু) সঙ্গে বিয়ে বিয়ে দেন। বৃহস্পতিবার সকালে পরিবারের সাতজনসহ কয়েকজন আত্মীয়কে নিয়ে একটি মাইক্রোবাসে করে সেখানে যান রাজ্জাক।
দুপুরে বিয়ের পর নববধূকে নিয়ে মোংলায় বাড়ি ফিরছিলেন বরের পরিবারের সদস্যরা। তাদের বহনকারী মাইক্রোবাসটি মোংলার কাছাকাছি রামপাল উপজেলার বেলাইব্রিজ এলাকায় পৌঁছালে বিপরীত দিক থেকে আসা নৌ-বাহিনীর একটি স্টাফ বাসের সঙ্গে মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়।
ভয়াবহ ওই দুর্ঘটনায় মোংলার এই বর ও কনের আর বাড়ি ফেরা হল না।
বরের পক্ষের নিহতরা হলেন- বর আহাদুর রহমান সাব্বির, তার বাবা আব্দুর রাজ্জাক, ভাই আব্দুল্লাহ সানি, বোন উম্মে সুমাইয়া ঐশী, তার ছেলে সামিউল ইসলাম ফাহিম, বড় ভাই আশরাফুল আলম জনির স্ত্রী ফারহানা সিদ্দিকা পুতুল, তাদের ছেলে আলিফ, আরফা ও ইরাম।
শুক্রবার ভোরে তাদের মরদেহ বাগেরহাটের মোংলার শেহালাবুনিয়ায় পৌঁছায়। আর কনে, তার বোন, দাদি ও নানির লাশ নেওয়া হয় খুলনার কয়রা উপজেলায়।
তারা হলেন- কনে মার্জিয়া আক্তার (মিতু), তার ছোট বোন লামিয়া আক্তার, দাদি রাশিদা বেগম ও নানি আনোয়ারা বেগম।
নিহতদের মধ্যে আরেকজন হলেন মাইক্রোবাস চালক নাইম। তার বাড়ি বাগেরহাটের রামপাল উপজেলার পেড়িখালি ইউনিয়নের সিংগেরবুনিয়া গ্রামে।
এছাড়া আহত অবস্থায় একজন খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
বর সাব্বিরের মোংলা শহরে মোবাইলের দোকান চালাতেন। আর কনে মিতু কয়রার নাকসা আলিম মাদ্রাসার আলিম প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী ছিলেন।
বরের বোন নিহত ঐশীর শ্বশুর মো. আব্দুল আলীম বলেন, “আমার বেয়াই রাজ্জাক ভাইয়ের আদি বাড়িও কয়রাতে। বিয়ের অনুষ্ঠানে আমিও ছিলাম।
“তারা ১২টার পর মাইক্রোবাসে করে মেয়ের বাড়ি থেকে রওনা দেন। আমার পুত্রবধূ একমাত্র নাতিও দুর্ঘটনায় মারা গেছেন।”
নিহত আব্দুর রাজ্জাকের ছোট ভাই সাজ্জাদ বলেন, “আশপাশের নয়টা মসজিদ থেকে খাটিয়া আনা হয়েছে। গোসল শেষ একে একে নয় স্বজনকে রাখা হয়েছে খাটিয়াতে।”
শুক্রবার দুপুরে জুমার নামাজের পর উপজেলা পরিষদ চত্বরে তাদের জানাজা শেষে পৌর কবরস্থানে দাফন করা হবে বলে জানান তিনি।
মোংলা উপজেলা পরিষদের সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান মো. নুর আলম শেখ বলেন, “বিএনপি নেতা আব্দুর রাজ্জাকের পরিবারের এতোগুলো মানুষ মারা যাওয়ায় এলাকার সব মানুষ হতবিহ্বল হয়ে পড়েছে।
“বিভিন্ন এলাকার মানুষ তার বাড়িতে ভিড় করছেন। কারও মুখে কোনো কথা নেই, সবার চোখ অশ্রুসিক্ত।”
কথা বলতে গিয়ে নুর আলমেরও চোখও কান্নায় ভিজে ওঠে। ধীরগলায় তিনি প্রশ্ন করেন, “কে কাকে সান্ত্বনা দেবে? এমন মৃত্যুর দায় কার? স্বাভাবিক মৃত্যুর নিশ্চয়তা কি?”
সদ্য খবর:
নয়টা মসজিদ থেকে খাটিয়া আনা হয়েছে। গোসল শেষ একে একে নয় স্বজনকে রাখা হয়েছে খাটিয়াতে
-
নিজস্ব প্রতিবেদক - আপডেট সময়: ০৪:৫৯:৩৪ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১৩ মার্চ ২০২৬
- ১০৭ ভিউ টাইম
ট্যাগ:
সর্বাধিক পঠিত














