একসময় কাকডাকা ভোরে কিংবা গভীর রাতের নিস্তব্ধতা ভেঙে শাহজাদপুরের প্রতিটি গাঁও-গেরাম থেকে ভেসে আসত ঢেঁকির পরিচিত ধুপধাপ শব্দ।
উঠানের মাটি বা রান্নাঘরের কোণে তাল মিলিয়ে ওঠা-নামা করা সেই কাঠের যন্ত্রটি কেবল চাল বা গুঁড়া তৈরির মাধ্যম ছিল না, বরং তা ছিল গ্রামীণ জীবনের স্বকীয় সুর ও উৎসবের রূপকার। তবে আধুনিক প্রযুক্তির দ্রুত বিকাশে গ্রামবাংলার জীবনযাত্রার দৃশ্যপট বদলে গেছে,মাটির ঘরের জায়গায় উঠেছে ইট-পাথরের দালান, আর যান্ত্রিকতার দাপটে ঢাকা পড়ে গেছে বাবলা কিংবা কড়ই কাঠে তৈরি ঐতিহ্যবাহী এই লোকশিল্পটি। ফলে ‘ধান ভানি রে, ঢেঁকিতে পার দিয়া-তরুণী-নববধূ ও কৃষানিদের কণ্ঠে গান গাওয়ার সেই মুখরিত দৃশ্য এখন শুধুই স্মৃতি।
পিঠা-পুলির নবান্ন ও হারানো সামাজিক বন্ধন
অতীতে গ্রামীণ জনপদে চাল ভেঙে আটা তৈরির প্রধান উৎসই ছিল ঢেঁকি। পোরজনা গ্রামের হাসিনা (৭০) ছকিনা (৭১)তারা আক্ষেপ করে জানান, অগ্রহায়ণ ও পৌষ মাসে ঘরে ঘরে নতুন ধানের চাল ও গুঁড়া তৈরির ধুম পড়ে যেত। দুধ পিঠা, তেলের পিঠা, চিতই, ফিরনি ও পায়েসের ঘ্রাণে ভরে উঠত চারপাশ, নতুন জামাইদের আগমন আর স্বজনদের আপ্যায়নে সৃষ্টি হতো এক রূপকথার পরিবেশ। বেলকুচির শিক্ষক আব্দুল মালেক ও কাজিপুরের সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান অধ্যক্ষ মোজ্জাম্মেল হক বকুল জানান, আগে নবান্নের দিনে পাখিডাকা ভোরে ঢেঁকির শব্দ শুনেই কৃষকেরা মাঠে যাওয়ার প্রহর গুনতেন। অথচ আজকের যান্ত্রিক যুগে সেই উৎসবের আনন্দ ও সামাজিক মেলবন্ধন বিলুপ্তির পথে।
যন্ত্রের জয়জয়কার, স্বাস্থ্য ও জীবিকার বড় সংকট
প্রযুক্তির বিবর্তনে গ্রামের অলিগলিতে বসানো হয়েছে আধুনিক রাইস মিল। জামতৈল বাজারের রাইস মিল মালিক সেলিম জানান, প্রতি বস্তা ধান ভাঙাতে মাত্র ৪০-৪৫ টাকা এবং আতপ চালের আটা তৈরিতে প্রতি কেজিতে ১৫ টাকা মজুরি নেওয়া হয়। রাইস মিলে কম খরচ ও দ্রুত কাজ হওয়ার কারণে মানুষ আর ঢেঁকিমুখী হচ্ছে না। তবে এর ফলে বড় ধরনের সামাজিক ও স্বাস্থ্যগত ক্ষয়ক্ষতি হচ্ছে। প্রথমত, অতীতে বিধবা, স্বামীপরিত্যক্তা ও দরিদ্র নারীরা ঢেঁকিতে ধান ভেনে সম্মানজনক জীবিকা নির্বাহ করতেন; আজ তারা সেই পেশা হারিয়ে বাধ্য হয়ে দিনমজুরি বা ইটভাটার মতো কঠিন কাজের আশ্রয় নিচ্ছেন। দ্বিতীয়ত, স্বাস্থ্যবিজ্ঞান অনুযায়ী ঢেঁকিছাটা চালে থাকা ভিটামিন-বি কমপ্লেক্স, নিউট্রিশন ও ফাইবার বজায় থাকে, যা রাইস মিলের পলিশ করা চাল প্রক্রিয়াজাতকরণের সময় নষ্ট হয়ে যায়।
ঐতিহ্য সংরক্ষণ ও সচেতনতার তাগিদ
আজ গ্রামবাংলার ঐতিহ্যবাহী ঢেঁকি গোয়ালঘর বা অব্যবহৃত কোনো কোণে পড়ে থেকে ধ্বংস হচ্ছে। সচেতন মহলের মতে, যান্ত্রিকতা জীবনকে সহজ করলেও আমাদের বহু বছরের ইতিহাস, কৃষ্টি এবং অর্গানিক খাদ্য উপাদানকে কেড়ে নিচ্ছে। লোকশিল্প ও ঐতিহ্য টিকিয়ে রাখতে মেলা, জাদুঘর কিংবা প্রান্তিক নারীদের কুটির শিল্পের আওতায় এনে ঢেঁকিছাটা চালের বাজার তৈরি করা এখন সময়ের দাবি। তা না হলে ভবিষ্যতের প্রজন্মের কাছে গ্রামবাংলার এই অনন্য পরিচয়টি চিরতরে হারিয়ে যাবে।
মোঃ জুবায়ের হাসান, শাহজাদপুর 









