Dhaka ০৩:৪৭ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৭ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

দেবীগঞ্জে করতোয়া সেতু থেকে ফেলা হচ্ছে ময়লা: হুমকির মুখে নদীর প্রাণ ও পরিবেশ

পঞ্চগড়ের দেবীগঞ্জে করতোয়া নদীতে প্রতিনিয়ত ফেলা হচ্ছে মুরগির চামড়া, পালক, নাড়িভুঁড়ি, পঁচা ডিমের খোসা, হোটেলের উচ্ছিষ্টসহ নানা ধরনের ময়লা। বিশেষ করে নদীর ওপর নির্মিত করতোয়া সেতু থেকে এসব ময়লা ফেলার কারণে দূষিত হচ্ছে নদীর পানি। হুমকির মুখে পড়ছে নদীর পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য। স্থানীয়দের অভিযোগ, বিষয়টি দীর্ঘদিন ধরে চললেও নদী দূষণ বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ দেখা যাচ্ছে না।

গতকাল ২২ আগস্ট রাত ৯টার দিকে করতোয়া সেতুর ওপর থেকে মুরগির নাড়িভুঁড়িসহ বিভিন্ন ময়লা নদীতে ফেলার সময় আব্দুল মজিদ নামে এক ব্যক্তিকে বাধা দেন স্থানীয় পরিবেশকর্মীরা। তিনি ভ্যানে করে মুরগির মাংস বিক্রেতাদের দোকান থেকে এসব ময়লা সংগ্রহ করে নদীতে ফেলছিলেন।

আব্দুল মজিদ জানান, প্রতিদিন বিভিন্ন দোকান থেকে মুরগির চামড়া, পালক, নাড়িভুঁড়িসহ নানা ধরনের ময়লা সংগ্রহ করেন তিনি। এসব ময়লা ফেলার নির্দিষ্ট জায়গা না থাকায় এবং নদীতে ফেলা সহজ হওয়ায় সেতুর ওপর থেকে সেগুলো নদীতে ফেলছিলেন।

স্থানীয় বাসিন্দা মনিরুল ইসলাম বলেন, “প্রতিদিন এই করতোয়া নদীতে অসংখ্য মানুষ গোসল করেন। অথচ এখানে হাঁস-মুরগির পচা ডিম, হোটেলের সিদ্ধ ডিমের খোসা, মুরগির নাড়িভুঁড়িসহ বিভিন্ন ময়লা ফেলা হচ্ছে। এতে নদীর পানি নষ্ট হচ্ছে। এসব দ্রুত বন্ধ করা উচিত।”দেবীগঞ্জ সাহাপাড়া এলাকার বাসিন্দা সমর রঞ্জন পাল বলেন, “দেবীগঞ্জ বাজারের মুরগি ও বয়লার ব্যবসায়ীরা সারাদিনের ময়লা বালতিতে জমিয়ে রাখেন। রাতে এক শ্রেণির ব্যক্তি প্রতিটি দোকান থেকে এসব ময়লা সংগ্রহ করে সেতুর ওপর থেকে নদীতে ফেলে দেন। বিষয়টি অনেকেই জানেন। কিন্তু কেউ প্রতিবাদ না করায় এসব বন্ধ হচ্ছে না।”

এ বিষয়ে দেবীগঞ্জ পৌর প্রশাসক ও সহকারী কমিশনার (ভূমি) আব্দুল্লাহ বিন জিয়া বলেন, পৌরসভার পক্ষ থেকে বাজারের বিভিন্ন স্থানে ঢাকনাযুক্ত ডাস্টবিন দেওয়া হয়েছে। পশু ও হাঁস-মুরগি জবাইয়ের পর বর্জ্য সংরক্ষণের জন্যও ডাস্টবিন রয়েছে। প্রতিদিন পৌরসভার গাড়িতে এসব বর্জ্য অপসারণ করা হয়। যারা নদীতে বর্জ্য ফেলছেন, তারা সচেতনতার অভাবে এমনটি করে থাকতে পারেন।

তবে সরেজমিনে দেবীগঞ্জ কাঁচাবাজার ঘুরে মুরগি, মাছ ও মাংস বিক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে ভিন্ন চিত্র পাওয়া গেছে। ব্যবসায়ীদের দাবি, প্রাণীজ বর্জ্য সংরক্ষণের জন্য বাজারে কোনো ডাস্টবিন নেই। নেই কোনো পরিচ্ছন্নতাকর্মীও। কাঁচাবাজার এলাকার অধিকাংশ আবর্জনা ব্যবসায়ীরাই নিজেদের উদ্যোগে পরিষ্কার করেন।
দেবীগঞ্জ কাঁচাবাজারের মুরগির মাংস বিক্রেতা আরিফ ও সোহেল জানান, সারাদিন জবাই করা মুরগির উচ্ছিষ্ট তারা জমিয়ে রাখেন। পরে ভ্যানচালকের মাধ্যমে এসব বর্জ্য দূরবর্তী স্থানে ফেলে দেওয়ার কথা। তবে ভ্যানচালক যে এসব বর্জ্য নদীতে ফেলে দেন, তা তারা জানতেন না। তাদের ভাষ্য, দেবীগঞ্জ বাজারে প্রাণীজ বর্জ্য ফেলার জন্য নির্দিষ্ট কোনো ডাস্টবিন নেই, পাশাপাশি পরিচ্ছন্নতাকর্মীরও ব্যবস্থা নেই।

বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) পঞ্চগড় জেলার সাধারণ সম্পাদক আজাহারুল ইসলাম জুয়েল বলেন, নদী প্রকৃতি ও পরিবেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপাদান এবং পানির প্রধান উৎস। প্রকৃতি, পরিবেশ ও প্রতিবেশ সংরক্ষণ এবং চাষাবাদের পানির জন্য নদী গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। নদীতে ময়লা-আবর্জনা ও বর্জ্য ফেলা পরিবেশ দূষণের পাশাপাশি দণ্ডনীয় অপরাধ।

তিনি বলেন, “বাংলাদেশের আইন অনুযায়ী নদীতে বর্জ্য ফেলার জন্য সর্বোচ্চ পাঁচ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড, ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত জরিমানা অথবা উভয় দণ্ডের বিধান রয়েছে। তাই নদীতে কলকারখানার বর্জ্য ও ময়লা-আবর্জনা ফেলা থেকে বিরত থাকা দেশের নাগরিক হিসেবে সবার সামাজিক ও নৈতিক দায়িত্ব। এ বিষয়ে জনগণকে সচেতন করার কোনো বিকল্প নেই।”

স্থানীয়দের দাবি, করতোয়া নদীকে বর্জ্য ফেলার স্থানে পরিণত না করে দ্রুত নদী দূষণ বন্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। নিয়মিত নজরদারি ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনার ব্যবস্থা না করা হলে ভবিষ্যতে নদীর স্বাভাবিক পরিবেশ ও পানির গুণগত মান আরও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

ট্যাগ:
About Author Information

সর্বাধিক পঠিত

দেবীগঞ্জে করতোয়া সেতু থেকে ফেলা হচ্ছে ময়লা: হুমকির মুখে নদীর প্রাণ ও পরিবেশ

আপডেট সময়: ০৫:৩২:৫৭ অপরাহ্ন, রবিবার, ২৩ অগাস্ট ২০২৬

পঞ্চগড়ের দেবীগঞ্জে করতোয়া নদীতে প্রতিনিয়ত ফেলা হচ্ছে মুরগির চামড়া, পালক, নাড়িভুঁড়ি, পঁচা ডিমের খোসা, হোটেলের উচ্ছিষ্টসহ নানা ধরনের ময়লা। বিশেষ করে নদীর ওপর নির্মিত করতোয়া সেতু থেকে এসব ময়লা ফেলার কারণে দূষিত হচ্ছে নদীর পানি। হুমকির মুখে পড়ছে নদীর পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য। স্থানীয়দের অভিযোগ, বিষয়টি দীর্ঘদিন ধরে চললেও নদী দূষণ বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ দেখা যাচ্ছে না।

গতকাল ২২ আগস্ট রাত ৯টার দিকে করতোয়া সেতুর ওপর থেকে মুরগির নাড়িভুঁড়িসহ বিভিন্ন ময়লা নদীতে ফেলার সময় আব্দুল মজিদ নামে এক ব্যক্তিকে বাধা দেন স্থানীয় পরিবেশকর্মীরা। তিনি ভ্যানে করে মুরগির মাংস বিক্রেতাদের দোকান থেকে এসব ময়লা সংগ্রহ করে নদীতে ফেলছিলেন।

আব্দুল মজিদ জানান, প্রতিদিন বিভিন্ন দোকান থেকে মুরগির চামড়া, পালক, নাড়িভুঁড়িসহ নানা ধরনের ময়লা সংগ্রহ করেন তিনি। এসব ময়লা ফেলার নির্দিষ্ট জায়গা না থাকায় এবং নদীতে ফেলা সহজ হওয়ায় সেতুর ওপর থেকে সেগুলো নদীতে ফেলছিলেন।

স্থানীয় বাসিন্দা মনিরুল ইসলাম বলেন, “প্রতিদিন এই করতোয়া নদীতে অসংখ্য মানুষ গোসল করেন। অথচ এখানে হাঁস-মুরগির পচা ডিম, হোটেলের সিদ্ধ ডিমের খোসা, মুরগির নাড়িভুঁড়িসহ বিভিন্ন ময়লা ফেলা হচ্ছে। এতে নদীর পানি নষ্ট হচ্ছে। এসব দ্রুত বন্ধ করা উচিত।”দেবীগঞ্জ সাহাপাড়া এলাকার বাসিন্দা সমর রঞ্জন পাল বলেন, “দেবীগঞ্জ বাজারের মুরগি ও বয়লার ব্যবসায়ীরা সারাদিনের ময়লা বালতিতে জমিয়ে রাখেন। রাতে এক শ্রেণির ব্যক্তি প্রতিটি দোকান থেকে এসব ময়লা সংগ্রহ করে সেতুর ওপর থেকে নদীতে ফেলে দেন। বিষয়টি অনেকেই জানেন। কিন্তু কেউ প্রতিবাদ না করায় এসব বন্ধ হচ্ছে না।”

এ বিষয়ে দেবীগঞ্জ পৌর প্রশাসক ও সহকারী কমিশনার (ভূমি) আব্দুল্লাহ বিন জিয়া বলেন, পৌরসভার পক্ষ থেকে বাজারের বিভিন্ন স্থানে ঢাকনাযুক্ত ডাস্টবিন দেওয়া হয়েছে। পশু ও হাঁস-মুরগি জবাইয়ের পর বর্জ্য সংরক্ষণের জন্যও ডাস্টবিন রয়েছে। প্রতিদিন পৌরসভার গাড়িতে এসব বর্জ্য অপসারণ করা হয়। যারা নদীতে বর্জ্য ফেলছেন, তারা সচেতনতার অভাবে এমনটি করে থাকতে পারেন।

তবে সরেজমিনে দেবীগঞ্জ কাঁচাবাজার ঘুরে মুরগি, মাছ ও মাংস বিক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে ভিন্ন চিত্র পাওয়া গেছে। ব্যবসায়ীদের দাবি, প্রাণীজ বর্জ্য সংরক্ষণের জন্য বাজারে কোনো ডাস্টবিন নেই। নেই কোনো পরিচ্ছন্নতাকর্মীও। কাঁচাবাজার এলাকার অধিকাংশ আবর্জনা ব্যবসায়ীরাই নিজেদের উদ্যোগে পরিষ্কার করেন।
দেবীগঞ্জ কাঁচাবাজারের মুরগির মাংস বিক্রেতা আরিফ ও সোহেল জানান, সারাদিন জবাই করা মুরগির উচ্ছিষ্ট তারা জমিয়ে রাখেন। পরে ভ্যানচালকের মাধ্যমে এসব বর্জ্য দূরবর্তী স্থানে ফেলে দেওয়ার কথা। তবে ভ্যানচালক যে এসব বর্জ্য নদীতে ফেলে দেন, তা তারা জানতেন না। তাদের ভাষ্য, দেবীগঞ্জ বাজারে প্রাণীজ বর্জ্য ফেলার জন্য নির্দিষ্ট কোনো ডাস্টবিন নেই, পাশাপাশি পরিচ্ছন্নতাকর্মীরও ব্যবস্থা নেই।

বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) পঞ্চগড় জেলার সাধারণ সম্পাদক আজাহারুল ইসলাম জুয়েল বলেন, নদী প্রকৃতি ও পরিবেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপাদান এবং পানির প্রধান উৎস। প্রকৃতি, পরিবেশ ও প্রতিবেশ সংরক্ষণ এবং চাষাবাদের পানির জন্য নদী গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। নদীতে ময়লা-আবর্জনা ও বর্জ্য ফেলা পরিবেশ দূষণের পাশাপাশি দণ্ডনীয় অপরাধ।

তিনি বলেন, “বাংলাদেশের আইন অনুযায়ী নদীতে বর্জ্য ফেলার জন্য সর্বোচ্চ পাঁচ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড, ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত জরিমানা অথবা উভয় দণ্ডের বিধান রয়েছে। তাই নদীতে কলকারখানার বর্জ্য ও ময়লা-আবর্জনা ফেলা থেকে বিরত থাকা দেশের নাগরিক হিসেবে সবার সামাজিক ও নৈতিক দায়িত্ব। এ বিষয়ে জনগণকে সচেতন করার কোনো বিকল্প নেই।”

স্থানীয়দের দাবি, করতোয়া নদীকে বর্জ্য ফেলার স্থানে পরিণত না করে দ্রুত নদী দূষণ বন্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। নিয়মিত নজরদারি ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনার ব্যবস্থা না করা হলে ভবিষ্যতে নদীর স্বাভাবিক পরিবেশ ও পানির গুণগত মান আরও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।